অনুসন্ধিৎসু চক্র

May 23, 2017 at 7:17 am

স্মরণ: ড. এ. আর. খান


স্মরণ: ড. এ. আর. খান

(জন্ম: ১৯৩২ খ্রি., মৃত্যু: ২৫ মে, ২০১৫ খ্রি.)

ধর, তোমরা একটা মহাকাশযানে করে ঘুরে বেড়াচ্ছ। তারপর দেখলে যে একটা সুন্দর গ্রহ দেখা যায়। নীল, তার মধ্যে আবার সাদা সাদা মেঘ। কাছে গিয়ে দেখলে যে এখানে জীবন আছে, গাছ আছে, জীব আছে। কিন্তু আরেকটু কাছে গিয়ে দেখলে যে এখানে বুদ্ধিমান জীব আছে! কিন্তু আরেকটু কাছে গিয়ে দেখলে যে, এই বুদ্ধিমান জীবেরা একে অপরকে হত্যা করার জন্য সবচেয়ে বেশি খরচ করে। তখন কি তোমরা সেই গ্রহতে নামবে? নিশ্চয়ই নামবে না। আমরা সেই অবস্থায় আছি। এ জন্যই আমি মনে করি যে, আমরা যদি মহাবিশ্ব সম্পর্কে একটা অনুভূতি নিজের মনে রাখতে পারি,তাহলে আমরা মনুষ্যত্ব বলতে যেটা বুঝায় তার অন্তত কিছুটা আমরা পাব। – কথাগুলো দেশের অন্যতম জ্যোতির্বিদ প্রয়াত ড. আনোয়ারুর রহমান খানের। যিনি ড. এ আর খান নামে আমাদের মাঝে পরিচিত। দুই বছর পূর্বে ২০১৫ সালের ২৫ মে লন্ডনের একটি হাসপাতালে তিনি শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন।

ড. এ আর খান এর জন্ম ১৯৩২ সালে ঢাকার বিক্রমপুরের (বর্তমানে মুন্সিগঞ্জ জেলা) শ্রীনগর উপজেলার ষোলঘর গ্রামে। তাঁর পিতা আলতাফুর রহমান খান ও মা আফজাউল নেসা খাতুন। পারিবারিক ঐতিহ্যের সূত্র ধরে দাদা থেকে নাতি প্রত্যেকের নামের সংক্ষিপ্ত রুপ এ আর খান। ১৯৪৬ সালে তিনি কুমিল্লা জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যায় ভর্তি হন। ১৯৫৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পাশ করার পর এ আর খান বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষকরুপে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৬০ সালে তিনি কলম্বো প্লান ফেলো হিসেবে যুক্তরাজ্য যান। সেখানে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত ন্যাশনাল ফিজিক্যাল ল্যাবরেটরি এবং ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাভেন্ডিস ল্যাবরেটরিতে গবেষকরুপে কাজ করেন। পিএইচডি করার সময় ১৯৬২ সাল থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত তিনি লন্ডনের ইমপেরিয়াল সায়েন্স এন্ড টেকনোলজিতে শিক্ষকতা ও গবেষণা করেন। এখান থেকে তিনি ১৯৬৭ সালে পদার্থবিদ্যায় পিএইচডি ডিগ্রী অর্জনের পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত পদার্থ বিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে প্রত্যাবর্তন করেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের উষালগ্নে তিনি ঢাকা থেকে গ্রামে এসে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেন। এসময় তিনি ষোলঘর বাজারে এক নারী নির্যাতনকারীকে হাত বেঁধে রোদে দাঁড় করিয়ে প্রকাশ্যে শাস্তি দেন। যা শ্রীনগরে ছড়িয়ে পড়লে মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে এলাকায় দ্বিতীয় নারী নির্যাতনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়নি। স্বাধীনতার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক থাকাকালীন নিজ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করে জয়ী হন। দুদফায় তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন। দেশে ফিরে তিনি তরুণদের মাঝে বিজ্ঞান ও প্রযু্িক্তকে ছড়িয়ে দিতে বিজ্ঞান আন্দোলনে যুক্ত হোন। ১৯৭৫ সালে অনুসন্ধিৎসু চক্র বিজ্ঞান সংগঠনের যাত্রা শুরু হয়। এ সংগঠনের প্রথম সভাপতি ছিলেন নটরডেম কলেজের পদার্থ বিজ্ঞানের শিক্ষক তমাল কান্তি দত্ত। তাঁর পরে অনুসন্ধিৎসু চক্রের সভাপতির দায়িত্ব অর্পিত হয় এ আর খানের উপর। দীর্ঘদিন তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশে হ্যালির ধূমকেতু পর্যবেক্ষণে গঠিত জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন তিনি। অনুসন্ধিৎসু চক্রের উদ্যোগে ২০০৩ সালে দেশজুড়ে মঙ্গল উৎসব, ২০০৪ সালের শুক্রগ্রহের ট্রানজিট, ২০০৯ সালে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ আয়োজনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। বাংলাদেশে ২০০৬ সালের ৩১ জানুয়ারি ঠাকুরগাও জেলায় উল্কাপিন্ড পতনের ঘটনা ঘটে। ১৯৪২ সালের পর এটিই বাংলাদেশের একমাত্র উল্কাপিন্ড পতন। সেসময় ড. এ আর খানের নেতৃত্বে গঠন করা সিংপাড়া উল্কাপিন্ড জাতীয় কমিটি। তখন বাংলাদেশ সরকারকে দুর্লভ এই উল্কাপিন্ড সংগ্রহে সহযোগিতা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় প্রধান ভূমিকা রাখে অনুসন্ধিৎসু চক্র। ইউনেস্কো ২০০৯ সালকে আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান বছর হিসেবে ঘোষণা করে। প্যারিসে এ উপলক্ষে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন।

ar_khan_observing_vt2004 copy
ড. এ আর খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত পদার্থ বিজ্ঞান ও ইলেকট্রনিক্স বিভাগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাঁর প্রকাশিত গবেষণাপত্রের সংখ্যা ২০ এর অধিক। তিনি দীর্ঘদিন দেশে বিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার প্রসারে কাজ করে গেছেন। ২০০৩ সালে দেশে বিজ্ঞান চর্চায় গুরত্বপূর্ণ অবদান রাখার জন্য অনুসন্ধিৎসু চক্র ড. এ আর খানকে বিশেষ ’অনুসন্ধিৎসু’ সম্মাননা প্রদান করে। জ্যোতির্বিদ ড. এ আর খান তরুণদের সাথে কাজ করতেন। নিজেও ছিলেন তরণপ্রাণ। নিজে সাইকেল চালাতেন। তরুণদের বলতেন, সাইকেল চালালে স্বাস্থ্য ভালো থাকে, পরিবেশও দূষণমুক্ত থাকে। তিনি ছবি তুলতে পছন্দ করতেন। দাবা ফেডারেশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ছিলেন দেশের প্রথম আন্তর্জাতিক আরবিটার বা দাবা বিচারক। তিনি বিজ্ঞান সং®কৃতি পরিষদ, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিকাল সোসাইটি, বাংলাদেশ ঘুড়ি ফেডারেশনের সাথেও যুক্ত ছিলেন। জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরের আঙ্গিনায় একটি বিশালাকার সৌরঘড়ি রয়েছে, যার নাম ’ড. এ আর খান সৌরঘড়ি’। অনুসন্ধিৎসু চক্রের জ্যোতির্বিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি মো. শাহজাহান মৃধার তত্ত্বাবধানে এটি নির্মিত হয়েছে।

তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর কাজ, আদর্শ রয়ে যাবে। দেশে জ্যোতির্বিজ্ঞানকে জনপ্রিয়করণে তাঁর অবদান নতুন প্রজন্মকে উৎসাহিত করবে, পথ দেখাবে। ড. এ. আর. খানের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি রইলো আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *